
নিজস্ব প্রতিবেদক :- ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে পোশাকশ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে (২৮) পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী এবং মরদেহ পোড়ানোর নির্দেশদাতা মাওলানা মো. ইয়াছিন আরাফাতকে (২৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বুধবার বিকেলে ডিএমপির সহযোগিতায় ঢাকার ডেমরা থানাধীন সারুলিয়া এলাকার একটি মাদ্রাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বৃহস্পতিবার সকালে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ইয়াছিন আরাফাত ভালুকার দক্ষিণ হবিরবাড়ী এলাকার গাজী মিয়ার ছেলে। তিনি স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি এবং মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন।
হত্যাকাণ্ডে ইয়াছিনের ভূমিকা
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গত ১৮ ডিসেম্বর ভালুকার জামিরদিয়া এলাকায় অবস্থিত পাইওনিয়ার নিটওয়্যার লিমিটেডের ভেতরে দিপু চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। ইয়াছিন আরাফাত সেদিন কারখানার গেটে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিয়ে লোক জড়ো করেন এবং শ্রমিকদের উত্তেজিত করে তোলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং ডিজিটাল আলামত (ভিডিও ফুটেজ) বিশ্লেষণ করে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে, দিপুকে নৃশংসভাবে মারধর করে হত্যার পর তার নিথর দেহ রশি দিয়ে বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে স্কয়ার মাস্টারবাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই ইয়াছিন আরাফাত।
আত্মগোপন ও গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া
হত্যাকাণ্ডের পর ভিডিও ফুটেজে নিজের চেহারা শনাক্ত হওয়ার ভয়ে ইয়াছিন আরাফাত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। প্রায় ১২ দিন পলাতক থাকার পর তিনি ঢাকার ডেমরা এলাকার ‘সুফফা’ নামক একটি মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং পরিচয় গোপন করে আত্মগোপনের চেষ্টা চালান। ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ প্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান নিশ্চিত করে এবং ডেমরা থানা পুলিশের সহায়তায় তাকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়।
মামলার বর্তমান অবস্থা
ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, দিপু চন্দ্র দাস হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত ইয়াছিন আরাফাতসহ মোট ২১ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে:
* ১৮ জন আসামি রিমান্ড শেষে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে রয়েছেন।
* ৯ জন আসামি বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
* ৩ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
* বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
গত ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ রাতে ভালুকার ডুবালিয়াপাড়া এলাকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পাইওনিয়ার নিটওয়্যার কারখানার শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত দিপু তারাকান্দা উপজেলার মোকামিয়াকান্দা গ্রামের রবি চন্দ্র দাসের ছেলে। অভিযোগ ওঠে, কারখানার ভেতরে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়িয়ে এই গণপিটুনি ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
এই ঘটনার একটি নৃশংস ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে এবং আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ১৯ ডিসেম্বর নিহতের ছোট ভাই অপু চন্দ্র দাস বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ১৪০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করে ভালুকা মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগটির পেছনে কোনো শক্ত ভিত্তি ছিল না, বরং কারখানার অভ্যন্তরীণ কোনো দ্বন্দ্ব বা উসকানি এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের কারণ হতে পারে।
উল্লেখ্য, ভালুকার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং আইন-শৃঙ্খলার ওপর একটি বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধান অভিযুক্ত ইয়াছিন আরাফাত গ্রেপ্তার হওয়ার মাধ্যমে মামলার তদন্তে বড় ধরনের অগ্রগতি হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভুক্তভোগী পরিবার এবং এলাকাবাসী এখন দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছেন।



Discussion about this post