
বশিরুল আলম, আলমডাঙ্গা (চুয়াডাঙ্গা) থেকে:- চুয়াডাঙ্গা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আওতাধীন চুয়াডাঙ্গা সদরের রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন সরকারি খাদ্য গুদামে ধান ক্রয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে ব্যবসায়ী ও দালালদের কাছ থেকে নিম্নমানের ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সরেজমিনে খাদ্য গুদাম এলাকা পরিদর্শনে দেখা যায়, সেখানে কৃষকদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। অধিকাংশ সময় ব্যবসায়ী ও মধ্যস্থভোগীদেরই গুদাম চত্বরে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, কৃষকদের নাম ব্যবহার করে দালালদের মাধ্যমে ধান সরবরাহ করা হচ্ছে, ফলে প্রকৃত কৃষকরা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে সরকারিভাবে চুয়াডাঙ্গা সদরে মাত্র ৪১ টন ধান ক্রয়ের বরাদ্দ থাকলেও গত বছরের ২০ নভেম্বর ২০২৫ থেকে ধান সংগ্রহ শুরু করে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৬৫১ টন ধান কেনা হয়েছে। নির্ধারিত বরাদ্দের বাইরে এত বিপুল পরিমাণ ধান কীভাবে ক্রয় করা হলো—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। সরেজমিনে গুদামে রাখা ধানের বস্তা পরীক্ষা করে দেখা যায়, ধানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চিটা ধান রয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ধানের আদ্রতা সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ হওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, বেশি আদ্রতার ধানও গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও প্রতি মণ ধানে ১ কেজি করে অতিরিক্ত ঢলন নেওয়া এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। নীতিমালা অনুযায়ী একজন কৃষকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ তিন টন ধান কেনার বিধান থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, দালালদের মাধ্যমে একাধিক কৃষকের নামে এর চেয়ে অনেক বেশি ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে করে প্রকৃত কৃষকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।এ বিষয়ে সদর এলএসডি খাদ্য পরিদর্শক মিরাজ হোসাইনের কার্যালয়ে প্রতিবেদক গেলে তিনি আংশিক তথ্য প্রদান করেন। অনিয়মের বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট জবাব দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। কৃষকদের ধান ক্রয়ের রশিদ ও চিটাযুক্ত ধানের নমুনা দেখানোর অনুরোধ জানালে তিনি তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানান এবং বলেন, এসব দেখাতে তিনি বাধ্য নন। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় তিনি নগদ অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে পজিটিভ নিউজ করার অনুরোধও করেন। তিনি আরও দাবি করেন, সরকারিভাবে বরাদ্দ ৪১ টন থাকলেও মুক্ত ঘোষণার পর প্রতি কেজি ৩৪ টাকা দরে মোট ৬৫১ টন ধান কেনা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কৃষক ও ব্যবসায়ী জানান, গুদামে ধান দিতে গেলে প্রতি মণে নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন দিতে হয়েছে। ধান মানসম্মত হলেও নানা অজুহাতে রিজেক্ট দেখিয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়েছে বলেও তারা অভিযোগ করেন।এ বিষয়ে সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হাসান মিয়া বলেন, চলতি মৌসুমে সারা দেশের জন্য ধান ক্রয় উন্মুক্ত করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গার অন্যান্য উপজেলার তুলনায় সদর উপজেলায় কম ধান কেনা হয়েছে। ধান ক্রয়ের তথ্য গোপন করার কিছু নেই এবং সবকিছুই নিয়ম মেনেই করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মুহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, তিনি বর্তমানে জেলার বাইরে অবস্থান করছেন। তার মতে, এ ধরনের অনিয়ম ঘটার কথা নয় এবং কোনো তথ্য গোপন করার সুযোগ নেই। কৃষকদের ধান বিক্রির রশিদ ও অনিয়ম সংক্রান্ত বিষয়ে যাচাই করার সুযোগ অবশ্যই রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এদিকে সরকারি খাদ্য গুদামে ধান ক্রয়ে ওঠা এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কৃষক ও সচেতন মহল। তাদের মতে, তদন্ত না হলে ভবিষ্যতেও একই অনিয়ম চলমান থাকবে এবং প্রকৃত কৃষকরা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন।



Discussion about this post