মাহাবুর রহমান:- গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় অবৈধভাবে মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের রোজকার কর্মকাণ্ড। ফসলি জমি ধ্বংস, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন, গ্রামীণ জনপদ ধ্বংস এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কার কথা জানিয়ে স্থানীয়রা বলেন, ফসলি জমির টপ সয়েল ও বালু উত্তোলন চক্রের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন কঠোর ভূমিকায় থেকে মাটি কাটায় ব্যবহিত এসকেভেটর (বেকু মেশিন), টলী ও ড্রাম ট্রাক ইত্যাদি সরঞ্জাম জব্দ করে তা বাজেয়াপ্ত করে দিতে হবে। নয়তো এসব বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন এলাকায় মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন, বিপণন ও পরিবহন ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন। কারণ হিসাবে জানাগেছে ঝটিকা অভিযানে জব্দ কৃত সরঞ্জাম পরবর্তীতে ছেড়ে দেওয়ায় চক্রটি দিনকে দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। জরিমানা আদায় কিংবা সরঞ্জাম জব্দ করলেই মাটি কাটা বন্ধ করা সম্ভব হবে না। জব্দ কৃত এসব সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত করতে হবে, তবেই বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে মত প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
স্থানীয় সূত্র ও প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শীতকাল আসলেই কাপাসিয়ার বিভিন্ন এলাকায় মাটি ও বালু উত্তোলনের প্রকোপ বেড়ে যায়। এসময় গ্রামাঞ্চলের রাস্তা ও কৃষি জমি সহ চারপাশ শুকনো থাকায় মাটি কেটে পরিবহন ও বিপণন করতে পারে খুব সহজেই। তথ্য রয়েছে উপজেলার সিংহশ্রী, রায়েদ, টোক, বারিষাব, সনমানিয়া, চাদপুর, নারায়পুর, ঘাগটিয়া ও তরগাও ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে মাটি কাটা শুরু হয়েছে। এ যেনো উৎসবে পরিনত হয়েছে। অপরদিকে নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকা টোক, সিংহশ্রী, বারিষাব ও সনমানিয়া ইউনিয়নের নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে দীর্ঘদিন ধরে কৃষি জমির টপ সয়েল ও নদীর পার কেটে ট্রাকযোগে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছিল। এতে করে ফসলি জমির শ্রেণি অবৈধভাবে পরিবর্তন, জমির উর্বরতা নষ্ট, নদী ভাঙ্গনের ঝুঁকি, সড়কের পাশের বসতভিটা ও সড়ক ঝুঁকিতে পড়া, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি সাধন হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হলে তারা অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ মাটি ও বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত এসকেভেটর (ভেকু মেশিন), ড্রামট্রাক, টলীসহ ইত্যাদি সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে আবার ছেড়ে দেওয়ায় মাটি কাটা, নদীর পার ও চরের বালু মাটি কাটা বন্ধের বিপরিতে উৎসবে পরিনত হচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একাধিক আইন সরাসরি লঙ্ঘন করা হচ্ছে। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া বালু বা মাটি উত্তোলন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভূমি ব্যবহার নীতিমালা অনুযায়ী ফসলি জমির মাটি কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪৩০ ও ৪৩১ ধারায় ক্ষতিসাধনের মামলা করার সুস্পষ্ট সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব আইনের প্রয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ বলেই অভিযোগ উঠছে।
এ বিষয়ে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নাহিদুল হক বলেন, “অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলন শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, এটি আগামীর কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ ও জননিরাপত্তায় হুমকিজনিত অপরাধ। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি এসকেভেটর (বেকু মেশিন) জব্দ ও জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অভিযানে গিয়ে মাটি খেকোদের সৃষ্ট প্রতিরোধে রোষানলে পরতে হয়েছে। তাতেও উপজেলা প্রশাসনের অভিযান তৎপরতা থেমে নেই। জনস্বার্থে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা অব্যাহত আছে, থাকবে। কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।
তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়—স্থায়ী সমাধান চাই। নিয়মিত অভিযান, জব্দকৃত যন্ত্র চূড়ান্তভাবে বাজেয়াপ্ত, জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা এবং প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়দাতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনলেই কেবল এই মাটি খেকো চক্রের লাগাম টানা সম্ভব। নইলে কাপাসিয়ায় অবৈধ মাটি কাটা বন্ধ নয়, বরং প্রশাসনের চোখের সামনেই এই লুটপাট আরও ভয়ংকর রূপ নেবে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ রুহুল আমিন রতন | মোবাঃ ০১৯১৫-০৯১৫২৯ , ০১৮৫৮-৩১০৮৩৫