
নিজস্ব প্রতিবেদক :: গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে নির্বাহী প্রকৌশলীসহ ১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
রবিবার (১১ জানুয়ারি) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশনায় এসব তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জারি করা দুটি পৃথক আদেশে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, শ্রীপুর পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ না করেই বিল উত্তোলন, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ এবং ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
একটি আদেশে শ্রীপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শাহেদ আক্তার-এর বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, পাথরের ঢালাইয়ের পরিবর্তে ২ নম্বর ইটের খোয়া ব্যবহার করেও পাথরের বিল উত্তোলন করা হয়েছে। বিটি বালু দিয়ে দুই ফুট ফিলিংয়ের কথা থাকলেও কাদা ও ময়লা মাটি দিয়ে ভরাট করে বালুর বিল তোলা হয়েছে।
এছাড়া রাস্তার দুই পাশে নির্ধারিত ১০ ইঞ্চি ইটের গাঁথুনির পরিবর্তে মাত্র ৫ ইঞ্চি গাঁথুনি করা হয়েছে, যা বর্তমানে রাস্তা ও ড্রেনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ড্রেন নির্মাণে সিমেন্ট-বালুর অনুপাত ঠিক না রাখা এবং রড ব্যবহারে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। এই অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের উপপরিচালককে। একই সঙ্গে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-কে অবহিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে জারি করা আরেক আদেশে শ্রীপুর পৌরসভার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আব্দুল কুদ্দুস হাওলাদার, উপ-সহকারী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ, নকশাকার জসীম উদ্দীন, সার্ভেয়ার মোস্তফা কামালসহ মোট ১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেওয়া পশ্চিম খণ্ড এলাকার বাসিন্দা মোঃ আতাউল্লাহ কর্তৃক দাখিল করা অভিযোগের ভিত্তিতে এ তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগে ক্ষমতার অপব্যবহার, ভুয়া নথি তৈরি, ঘুষ বাণিজ্য ও অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও সচেতন মহলের দাবি, গত কয়েক বছর ধরে শ্রীপুর পৌরসভায় একটি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে পৌরসভার কোটি কোটি টাকা লুটপাটের মূল হোতা ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী শাহেদ আক্তার ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ। তারা তৎকালীন মেয়র আনিছুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
নামে-বেনামে ভুয়া ফাইল তৈরি করে কাজ না করেই প্রকল্প সম্পন্ন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাত করা হতো বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের মূল কারিগর হিসেবে প্রকৌশলী হারুন অর রশিদের নাম বারবার উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র বরখাস্তের পর পৌর প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ব্যারিস্টার সজিব আহমেদ দায়িত্ব গ্রহণের পর ভুয়া বিল-ভাউচার বন্ধ করে পৌরসভার আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেন।
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি অর্থবছরে প্রায় ৬০–৭০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হলেও বিগত বছরগুলোতে উন্নয়ন ছিল মূলত কাগজে-কলমে। তবে প্রশাসকের নির্দেশনায় পরপর দুটি দরপত্রের মাধ্যমে প্রায় ৬৬টি প্যাকেজে শতাধিক রাস্তা উন্নয়নে প্রায় ২০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ বলছেন, ইতিপূর্বে এদের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগে অনেক তদন্ত হয়েছে, এসব তদন্ত শুধু কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। তারা দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং শ্রীপুর পৌরসভার উন্নয়ন কার্যক্রমে পূর্ণ স্বচ্ছতা ফেরানোর দাবি জানিয়েছেন।
গাজীপুর স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক (উপসচিব) আহাম্মদ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, পৌরসভায় উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এগুলি তদন্ত করতে কিছুদিন সময় লাগবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



Discussion about this post