
স্টাফ রিপোর্টার: ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসনে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মুশফিকুর রহমানের মনোনয়নের বৈধতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও আইনি জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর দ্বৈত নাগরিকত্ব, তথ্য গোপন এবং হলফনামায় অসত্য তথ্য প্রদানের অভিযোগে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট মহলে তোলপাড় চলছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের কোনো বৈধ প্রমাণ দাখিল না করেই তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা সংবিধান ও নির্বাচনী আইনের পরিপন্থী।
সরকারি ইমিগ্রেশন নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মুশফিকুর রহমান গত ২৫ আগস্ট ২০২৫ তারিখেও AS037031 নম্বরধারী একটি কানাডিয়ান পাসপোর্ট ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী তাঁর নাম ‘Mushfi Qur Rahman’ এবং জন্ম তারিখ ০৮-০১-১৯৪০। এমনকি জুলাই ও আগস্ট মাসেও তিনি দুবাই এবং প্যারিস থেকে কানাডিয়ান নাগরিক হিসেবেই যাতায়াত করেছেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, মনোনয়নপত্রের হলফনামায় তিনি দাবি করেছেন যে তিনি কানাডার নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। কিন্তু নাগরিকত্ব ত্যাগের কোনো সনদ বা বৈধ নথিপত্র তিনি জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়ে জমা দেননি।
কানাডা সরকারের ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী, নাগরিকত্ব ত্যাগের (Renunciation of Citizenship) প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সাধারণত ১১ থেকে ১৬ মাস সময় লাগে। কানাডা সরকার কর্তৃক 'Certificate of Renunciation' হাতে না পাওয়া পর্যন্ত কেউ নাগরিকত্বহীন হিসেবে গণ্য হন না।
মুশফিকুর রহমান দাবি করছেন তিনি ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। অথচ ওই একই সময়ে তিনি বিদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে ভ্রমণ করেছেন এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়াই এত দ্রুত নাগরিকত্ব ত্যাগের দাবিটি আইনত অসম্ভব ও ভিত্তিহীন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুরূপ অভিযোগে চট্টগ্রাম-৯ আসনে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী ডা. এ. কে. এম. ফজলুল হকের মনোনয়ন ইতিপূর্বে বাতিল করা হয়েছে। বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণ দেখাতে না পারা এবং তথ্য গোপন করার একই অপরাধে মুশফিকুর রহমানের প্রার্থিতাও বাতিল হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিকত্ব ধারণকারী ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্য নন। এছাড়া আরপিও (RPO) এর ১২(১)(গ) ধারা অনুযায়ী, তথ্য গোপন করলে মনোনয়ন সরাসরি বাতিলযোগ্য।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, মুশফিকুর রহমান কানাডায় দীর্ঘদিন অবস্থান করে সে দেশের সরকারি বয়স্ক ভাতা, বিনামূল্যে চিকিৎসা ও আবাসন সুবিধা ভোগ করে আসছেন। এখন নির্বাচনের আগে সুবিধা ভোগের উদ্দেশ্যেই নিজেকে কেবল বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করছেন, যা নৈতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ।
এদিকে, যথাযথ কাগজপত্র ছাড়াই তাঁর মনোনয়ন গৃহীত হওয়ায় স্থানীয় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী এই প্রার্থীর সঙ্গে প্রশাসনের কোনো গোপন সমঝোতা থাকতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সত্য গোপন করে মিথ্যা হলফনামা দেওয়া দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যথাযথ প্রমাণ ছাড়া মনোনয়ন গ্রহণ করা একটি বড় ধরনের আইনি বিচ্যুতি। সব মিলিয়ে, ভ্রমণ ইতিহাস ও নাগরিকত্ব ত্যাগের সময়সীমার অসংগতি মুশফিকুর রহমানের সংসদ সদস্য হওয়ার স্বপ্নকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিষয়টি এখন নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ রুহুল আমিন রতন | মোবাঃ ০১৯১৫-০৯১৫২৯ , ০১৮৫৮-৩১০৮৩৫