
নিজস্ব প্রতিবেদক: মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার গাড়াডোব গ্রামে মরহুম কিয়ামদ্দিন আলীর ২৩ তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দুইদিন ব্যাপী আয়োজিত ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র আলোচনা ও বিতর্ক। মাহফিলের আয়োজক ও সভাপতিত্বে মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের নাম উল্লখ থাকলেও মাহফিলে তিনি অনুপস্থিত। তিনি অনলাইন জুয়াড়ি হিসেবে জেলাব্যাপী পরিচিত। তার বিরুদ্ধে অনলাইন জুয়া সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থাকায় অনুষ্ঠানের বিরাট খরচের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে যার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ মামলা ও সাংবাদ শিরোনাম ছিল মেহেরপুরের শীর্ষ অনলাইন জোয়ার এজেন্ট আনোয়ার হোসেন। যিনি দুবাইয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। সেই ব্যাক্তিই হঠাৎ হয়ে গেছেন এলাকার দানবীর। বাবার মৃত্যু বার্ষিকীতে করছেন বিশাল এক ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন।
তবে ইসলামী বক্তাদের দাবি ইসলামে দিবস পালন করা বৈধ না। এরা হয়তো অবৈধ কালো টাকা সাদা করতেই এই আয়োজন করছে। মাহফিলের বক্তারা হয়তোবা জানে না যে অনলাইন জুয়ার টাকায় মাহফিল হচ্ছে, জানলে হয়তো তারা আসতো না।
স্থানীয় এলাকাবাসীর একাংশের দাবি, গাড়াডোব গ্রামের আনোয়ার হোসেন মেহেরপুর জেলায় অনলাইন জুয়ার শীর্ষ এজেন্টদের একজন হিসেবে পরিচিত। সেই অর্থেই কি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে বিপুল ব্যয়ে এই আয়োজন এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে। তাদের ভাষায় যে টাকার সঙ্গে জুয়া, তরুণদের সর্বনাশ আর পারিবারিক ধ্বংস জড়িয়ে, সেই টাকায় দানের নামে ইবাদত কি গ্রহণযোগ্য হতে পারে!।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন বলেন, ৫-৭ বছর আগেও আনোয়ার হোসেন পারিবারিকভাবেও স্বচ্ছল ছিলেন না। সেই কি না আজ বাবার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ লাখ টাকা ব্যয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন ও প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। গাড়াডোব মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিরাট আকারের একটি প্যান্ডেল নির্মান করা হয়েছে। বক্তাদের জন্য সুদর্শন একটি মঞ্চ এবং বিশাল এক তোরণ তৈরী করা হয়েছে। মাঠের আশেপাশের এলাকায় আলোকসজ্জা এবং ব্যানার ফেস্টুনে ছেয়ে দিয়েছেন আয়োজকরা। মাহফিলের বক্তা ও দেশসেরা ইসলামী সঙ্গীত শিল্পিরা আসবেন বলে মাইকিং চলছে বেশ কয়েকদিন থেকেই। তাই স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ দানা বাঁধছে। অনেকেই এটিকে কালো টাকা সাদা করার অপচেষ্টা বলেও মনে করছেন। গতবছর একই আয়োজন একদিনের জন্য করেছিলো। কিন্তু তার আগে কখনো মৃত কিয়ামদ্দীনের মৃত্যুবার্ষিকী আয়োজন চোখে পড়েনি।
জানা গেছে, আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে অনলাইন জুয়া সংশ্লিষ্ট একাধিক মামলা রয়েছে এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তদন্তও চলমান। সম্প্রতি সিআইডি মেহেরপুর জেলায় অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ১৯ জনের বিরুদ্ধে যে তদন্ত শুরু করেছে, সেই তালিকায় আনোয়ার হোসেনের নামও রয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এদিকে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে এ আয়োজন কীভাবে হলো তা নিয়েও প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অনলাইন জুয়াড়ি হিসেবে চিহ্নত ব্যাক্তব প্রকাশ্যে এভাবে ধর্মীয় মাহফিলের সভাপতিত্ব করেন, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরী বলে মনে করছেন এলাকার মানুষ।
নাগরিক সমাজ উদ্বেগ জানিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মেহেরপুর জেলা কমিটির সভাপতি সৈয়দ জাকির হোসেন বলেন, “অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে উঠতি বয়সী যুবকরা নিঃস্ব হচ্ছে, এটা সমাজের জন্য মারাত্মক ভয়াবহ দিক। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এসবের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতায় কাজ করছি। অনলাইন জুয়ার অর্থে ধর্মীয় আয়োজন প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিকভাবে যদি অনলাইন জুয়াড়িদের মূল উৎপাটন না করা যায়, তাহলে এ ধরনের ঘটনা চলতেই থাকবে। ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে মানুষকে বিপথগামী করা মোটেও কাম্য নয়। এসব আয়োজন অনেক সময় সমাজে প্রভাব বিস্তারের একটি কৌশল মাত্র।
এ বিষয়ে গাংনী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আনোয়ার হোসেন বলেন, “মাহফিল আয়োজনের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের অনুমতি লাগে। এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। জেলা প্রশাসনের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে মেহেরপুর জেলা প্রশাসক ড. সৈয়দ এনামুল কবির জানান, “মাহফিল আয়োজনের জন্য তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে পুলিশ সুপারের কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। তিনি ইতিবাচক মত দিয়েছেন। অনুমতি এখনো পেন্ডিং রয়েছে। তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে তারা অনুমতি পাবে। তবে এ মাহফিলঘিরে যদি নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ধর্মীয় নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় গাংনী উপজেলা ওলামা পরিষদের সভাপতি মাওলানা রুহুল আমিন বলেন, ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো দিবস পালন করা নিষিদ্ধ। অবৈধ টাকায় ধর্মীয় বৈধতা পাওয়া যায় না। যদি কেউ জেনে-বুঝে অনলাইন জুয়ার টাকায় আয়োজিত ওয়াজ মাহফিলে অংশ নেন, সেটি ইসলামসম্মত হতে পারে না। বক্তারা যদি জানতেন, তাহলে অনেকেই হয়তো এখানে আসতেন না।” এ বিষয়ে আনোয়ার হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য: ২০২৫ সালে গাড়াডোব গ্রামে একদিনব্যাপী এই রকম ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করেছিল আনোয়ার হোসেন।



Discussion about this post