পিঠা-বেগুণী বেচে জীবন বাঁচানোর স্বপ্ন দেখেন সাটুরিয়ার চায়নাল

প্রকাশিত: ২:০২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০২১

১২ জানুয়ারী ২০২১

মো. চায়নাল মিয়া। বয়স ৫৬।  শরীরে বয়সের ছাপ আর মাথার ওপর ৮০ হাজার টাকা ঋণের বোঝা। সেই ঋণ শোধ করতে ৫৬ বছর বয়সেও থেমে নেই চায়নালের জীবন সংগ্রাম। ঋণ পরিশোধ আর দু’মুঠো খাবারের জন্য এই বয়সেও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত করেন হাড়ভাঙা পরিশ্রম।

জীবনযুদ্ধে পরাজয় মানতে নারাজ চায়নাল। প্রতিদিন সকালে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজলার সাভার বাজারে ডিম বিক্রি করেন। বিকেলে রাস্তার ধারে বিক্রি করছেন পিঠা আর সন্ধ্যায় পিঁয়াজু, বেগুণী ও আলুরচপ বিক্রি করে জীবন বাঁচান চায়নাল।

বয়স যখন দেড়, তখন বাবা সমের উদ্দিনকে হারান। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে চায়নাল ছোট। ছোট হলেও দায়িত্ব ছিল বেশি। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে মাত্র এগারো বছর বয়সে ইটভাঙা কাজ শুরু করেন। মা, ভাই ও বোনদের দায়িত্ব নেন। এর মধ্যে বড় ভাই জমি-জমা বিক্রি করে মা ও তাকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যান।

টানা ১৫ বছর ইটভাঙা কাজ করেন এই জীবনযোদ্ধা। শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা ইটভাঙা কাজও অবশেষে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর শুরু করেন রিকসা চালানোর কাজ। তারপর মহাজনের নিকট থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়ে শুরু করেন জুতা আর কসমেটিকস ব্যবসা। তাতেই সফল হতে পারেননি চায়নাল। ভোর ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ডিম বেচে ৫০-৭০ টাকা আয় করে চায়নাল।

বিকেলে রাস্তার ধারে পিঠা বিক্রি করে ১০০-১৫০ টাকার মতো রোজগার হয়। সব মিলিয়ে প্রতিদিন তার রোজগার হয় প্রায় ২০০ টাকা। এ দিয়েই চলে একজনের সংসার। দেন সাপ্তাহিক এনজিওর কিস্তি। এই মানুষটির কাজের ফাঁকে ফাঁকে শোনান জীবনের গল্প।

মানিকগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার উকিয়ারা উত্তরপাড়া গ্রামে জন্ম নেয়া চায়নাল এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। মেয়ে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুড়ি এলাকায় বিয়ে হয়েছে। ছেলে একজন রাজমিস্ত্রির সহযোগী। ছেলে-মেয়ের কেউই তাদের বাবা-মায়ের খোঁজ নেন না। এ বয়সেও তাকে সকাল-সন্ধ্যা করতে হয় হাড়ভাঙা পরিশ্রম।

ছোটবেলায় লেখাপড়া করার প্রবল আগ্রহ ছিল চায়নাল। কিন্তু দারিদ্র্যতার কারণে তিনি তা করতে পারেননি। ইচ্ছা ছিল সন্তানদের লেখাপড়া করাবেন। তাতে ছেলে-মেয়ের কারোর আগ্রহ ছিল না। চায়নালের বাড়ির ভিটেমাটি বলতে মাত্র কিছুই নেই। থাকেন বোনের বাড়িতে।

স্থানীয় একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নেন চায়নাল। সেই টাকার কিছু অংশ দিয়ে রিকসা কিনেন তিনি। রিকসা চালানো ছেড়ে দিয়ে শুরু করেন জুতা ও কসমেটিকস ব্যবসা। তাতেও সফল হতে পারেনি চায়নাল। ঋণের সেই ৮০ হাজার টাকার প্রতি সপ্তাহের কিস্তি হিসেবে দিতে হচ্ছে ২ হাজার ১০০ টাকা। এজন্য সকাল-সন্ধ্যা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হচ্ছে এই তাকে।

মো. চায়নাল মিয়া আলোরবাণী বিডি ডট কমকে বলেন, ‘মাথার ওপর ঋণের বোঝা। এ ঋণ পরিশোধের জন্য আমি সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ডিম বিক্রি করি। বিকেলে রাস্তার পাশে বসে পিঠা। সন্ধ্যায় পিঁয়াজু ও বেগুণী বিক্রি করি। ঋণ পরিশোধের জন্যই আমি আমার নিজের এলাকা ছেড়ে সাটুরিয়ায় খালাতো ভাইয়ের বাসায় থেকে সংগ্রাম চালিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছি।’

সারাদিনে দুই কাজে ২০০ টাকা রোজগার হলেও সংসার চালানো আর কিস্তি পরিশোধ করতে হিমশিম খেতে হয় চায়নালকে। এই জীবনযোদ্ধা মনে করেন, কোনোমতে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারলে পরে প্রতিদিনের যে রোজগার হবে, তা দিয়েই সংসারের খরচটা চালিয়ে নেবেন। এখন ঋণ পরিশোধকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন পরিশ্রমী এই মধ্যবয়সী। পারবেন ঋণ পরিশোধ করে কোনোমতে দু’মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকতে।