প্রকাশিত: ৯:১০ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১১, ২০২১

১১ মার্চ ২০২১ ইং

শখ করে বাড়ির আঙিনায় দুটি বরই গাছের চারা রোপণ করেন কৃষক দুলাল হোসেন। গাছ দুটিতে প্রচুর পরিমাণে ফলন পাওয়ায় বেড়ে যায় আগ্রহ। এরপর ক্ষুদ্র পরিসরে বাণিজ্যিক চিন্তা ভাবনায় শুরু করেন বরই চাষাবাদের। চলতি মৌসুমে ১০ বিঘা জমিতে বরই চাষাবাদ করেছেন তিনি। কৃষি কাজে দারিদ্রতা থেকে মুক্তি না পেলেও বরই চাষে ভাগ্যবদল হয়েছে দুলাল হোসেনের।

অল্প খরচে অধিক মুনাফা হওয়ায় প্রতি বছরই বরই চাষাবাদের জমি বৃদ্ধি করছেন দুলাল হোসেন। কৃষি জমি ভাড়া নিয়ে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার জাগীর ইউনিয়নের মধ্য উকিয়ারা এলাকায় গড়ে তুলেছেন বেশ কয়েক’টি বরই বাগান। দুলাল হোসেন ছাড়াও এসব বরই বাগানে স্থায়ীভাবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে প্রায় ১০ জন কৃষি শ্রমিক।

বল সুন্দরী, আপেলকুল, কাশ্মীরি আপেলকুল, নারিকেল কুল, সিটলেস কুলসহ বিভিন্ন জাতের বড়ই রয়েছে দুলাল হোসেনের বাগানে। কৃষি কাজে তেমন সাফল্য না পেলেও বরই চাষাবাদে ভাগ্যবদল হয়েছে তার। প্রথম ‍দিকে মুনাফা কিছু কম হলেও বরই চাষাবাদে এখন বেশ লাভবান তিনি। দুলাল হোসেনের সাফল্য দেখে আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ছে বরই চাষির সংখ্যা।

দুলাল হোসেনের সঙ্গে আলাপ হলে তিনি বলেন, প্রায় দুই যুগ আগে তিনি বরই চাষাবাদ নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। যা এখন পুরোপুরি বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। ১০ বিঘা জমি ভাড়া নিয়ে গড়ে তুলেছেন বেশ কয়েকটি বরই বাগান। সেখানে স্থায়ীভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে প্রায় ১০ জনের। উন্নত জাতের বরইগুলোর স্থানীয় পাইকারি বাজারে বেশ চাহিদা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

বাড়ছে বরই চাষির সংখ্যা
এসময় তিনি বলেন, প্রতি বিঘা (৩০ শতাংশ) জমির জন্য বছরে জমির মালিককে দিতে হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। এছাড়াও শ্রমিক খরচসহ অন্যান্য সব খরচ মিলিয়ে বছরে প্রতি বিঘা জমিতে ব্যয় হয় প্রায় ২০ হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে ১০০টি গাছের চারা রোপণ করা যায়। প্রথম বছর প্রতিটি গাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ কেজি ফল পাওয়া যায়। বরই গাছের বয়স ৪/৫ বছর হলেই প্রতিটি গাছ থেকে দুই থেকে আড়ই মণ ফল পাওয়া যায় অনায়াসে।

চলতি মৌসুমে পাইকারি বাজারে প্রতি মণ বরই বিক্রি হচ্ছে ২৪ থেকে ২৫’শ টাকায়। ভালো এবং সতেজ বরই হওয়ায় স্থানীয় পাইকারি বাজারে চাহিদাও বেশ। বাগান থেকেই মানিকগঞ্জ ও আশেপাশের ফল ব্যবসায়ীরা এসব বরই ক্রয় করেন বলে জানান তিনি।

বগুড়ার ধুনট উপজেলার চকিবাড়ি ইউনিয়নের পাঁচথবি গ্রামের কৃষি শ্রমিক জামাল উদ্দিন বলেন, ১৯ বছর ধরে দুলাল হোসেনের বরই বাগানে কাজ করেন তিনি। আগে কাজের সন্ধানে নানান জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হতো। নিয়মিত কৃষি কাজ পাওয়া কষ্টকর ছিলো। তবে এখন আর সেই কষ্ট নেই। ১২ হাজার টাকা মাসিক বেতনে দুলাল হোসেনের বরই বাগানে কাজ করেন। এখানে কাজ করেই ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। এখানে কাজ করে বেশ ভালো আছেন বলেও জানান তিনি।

রেজিয়া বেগম নামে স্থানীয় এক নারী শ্রমিক বলেন, পারিবারিক অভাব অনটনে লেখাপড়া করতে পারেননি। কোন কাজের অভিজ্ঞতাও নেই। বাড়ির পাশে এমন একটি বরই বাগান থাকায় সেখানে স্থায়ীভাবে কাজের সুযোগ পেয়ে বেশ উপকার হয়েছে।

জমিতে বিভিন্ন জাতের বরই চাষ হচ্ছে
দুলাল হোসেনের ছেলে রাসেল হোসেন বলেন, বাড়ির পাশেই তাদের সবগুলো বরই বাগান। পড়াশোনার পাশাপাশি সে ও তার ছোট ভাই নিয়মিত বরই বাগানে কাজ করেন। বরই চাষাবাদে অন্যান্য ফসলের চেয়ে মুনাফাও কয়েকগুণ বেশি। অল্প সুদে কোন লোন পেলে বরই আবাদের জমির পরিমাণ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে। তবে বরই চাষাবাদের জমিগুলো নিজেদের না থাকায় চেষ্টা করেও কোন লোন পাওয়া যায়নি বলে জানায় রাসেল হোসেন।

মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, কৃষি পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিভিন্নভাবে অল্প সুদে লোন দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এসব ব্যক্তিদের লোনের জন্য এসএমই এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনার তহবিল থেকে খুব সহজেই চাহিদা অনুযায়ী লোন দেওয়া যায়। এ বিষয়ে কেউ যোগাযোগ করলে বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।

মানিকগঞ্জ কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহজাহান আলী বিশ্বাস বলেন, গত বছর মানিকগঞ্জে ৭৭ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে বরই চাষাবাদ হয়েছিল। চলতি মৌসুমে এর পরিমাণ আরও বাড়বে। অল্প খরচে অধিক মুনাফা হওয়ায় বরই চাষাবাদে কৃষকদের মাঝে আগ্রহ বাড়ছে বলেও জানান তিনি।